জীবনের আয়নায় গত বছরের ২১ জুলাইয়ের সেই সকাল এখনো অনেকের কাছে দুঃস্বপ্ন। আকাশ থেকে নেমে আসা আগুনের লেলিহান শিখা, আর্তনাদ আর বিধ্বস্ত স্কুল ভবনের সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত আজও তাড়িয়ে বেড়ায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অনেক শিক্ষার্থীকে। কিন্তু শোকের পাথর চাপা দিয়ে থেমে থাকেনি জীবন। সেই ট্র্যাজেডির এক বছর পর, শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে এবং প্রিয় বন্ধু ও স্বজনহারা শিক্ষার্থীদের মানসিক ক্ষত সারাতে গাজীপুরের পুবাইলের ছুটি রিসোর্টে আয়োজন করা হলো এক মানবিক কর্মযজ্ঞ- ‘সবুজের মাঝে অমর তোমরা’ (দ্বিতীয় পর্ব)।
সবুজের বুকে স্মৃতির বৃক্ষরোপণ
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দিনটি ছিল এক অন্যরকম অনুভূতির সাক্ষী। ছুটি গ্রুপ ও রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা কেবল খেলাধুলায় মত্ত থাকেনি, বরং হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি প্রাণের স্মরণে রোপণ করেছে স্মারক গাছ। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এই গাছগুলো কেবল নামফলক হয়ে থাকবে না, বরং প্রকৃতির বুকে বেঁচে থাকবে তাদের সেই প্রিয় সহপাঠীদের স্মৃতি। গাছগুলো বড় হবে, ডালপালা মেলবে। ঠিক যেমন আজকের বিষাদ ছাপিয়ে শিশুরা বড় হবে ভবিষ্যতের আলোর দিকে।
ট্রমা কাটিয়ে ওঠার লড়াই
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। আর্ট থেরাপি ‘ট্রি অব লাইফ’-এ মনিরা রহমানের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা ছবি ও রঙের মাধ্যমে প্রকাশ করে তাদের মনের অব্যক্ত কথা। দীর্ঘদিনের আতঙ্ক কাটাতে পেশাদার কাউন্সেলিং এবং প্রাণবন্ত ফুটবল ম্যাচ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফিরিয়ে এনেছে হারানো আত্মবিশ্বাস।
আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা সাংবাদিক ও রোটারিয়ান শাহনাজ শারমীন বলেন, বার্ন ইনস্টিটিউটে টানা ১২ দিন সংবাদ সংগ্রহের সময় এই শিশুদের যে অসহায়ত্ব দেখেছি, তা আমাকে এই আয়োজনের তাড়না জুগিয়েছে। ভালোবাসা আর সম্মিলিত প্রচেষ্টা যে অনেক বড় ক্ষত সারিয়ে তুলতে পারে, আজকের এই হাসিমুখগুলোই তার প্রমাণ।
নিভে যাওয়া স্বপ্নের নতুন দিগন্ত
দুর্ঘটনার সময় ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী ইউশার স্বপ্ন ছিল পাইলট হওয়ার। কিন্তু স্কুলের বারান্দায় বিমানের সেই আছড়ে পড়ার মুহূর্ত তার স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়। আজও সেই আতঙ্ক ইউশার চোখেমুখে। কিন্তু এই প্রকৃতির সান্নিধ্য যেন তাকে নতুন করে বাঁচতে শেখাচ্ছে। ইউশার মতো জান্নাতুল মাওয়া, যে কি না আজও শরীরের ঝলসে যাওয়া ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে, সেও আজ বন্ধুদের সঙ্গে হেসে-খেলে কাটালো অনেকটা সময়।
সামাজিক দায়বদ্ধতার বার্তা
রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকার প্রেসিডেন্ট রোটারিয়ান শরীফ উল্লাহ বলেন, শিশুদের মানসিক কষ্ট দূর করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। ছুটি রিসোর্ট পুবাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল ইসলাম ও ছুটি রিসোর্ট পূর্বাচলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর ফেরদৌস এই আয়োজনে যুক্ত হতে পেরে গর্বিত। তারা জানান, ব্যবসার বাইরে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তারা এই শিশুদের জন্য তাদের রিসোর্টের দ্বার সবসময় খোলা রেখেছেন।

ছুটি গ্রুপের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোস্তফা মাহমুদ আরিফী তার সমাপনী বক্তব্যে বলেন, আজ আমরা যে গাছ রোপণ করছি, তা শোকের চেয়েও অনেক বড় হয়ে বেড়ে উঠবে। এই শিশুরা কোনো সংবাদ শিরোনামে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তারা আগামীর আলোর দিকে ক্রমবর্ধমান এক সবুজ বনের মতো চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জীবন থেমে থাকে না
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ট্রমাগ্রস্ত শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে প্রকৃতির সান্নিধ্য ও সৃজনশীল কাজের কোনো বিকল্প নেই। মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পার হলেও ক্ষত পুরোপুরি মুছতে সময় লাগবে। তবে ‘সবুজের মাঝে অমর তোমরা’-এই স্লোগান নিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে ভালোবাসা আর সহমর্মিতার হাত ধরলে অন্ধকার কাটিয়ে আলোয় ফেরা সম্ভব।
জীবন থেমে থাকে না, আর মাইলস্টোনের এই শিক্ষার্থীরাও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখছে আগামীর দিকে তাকিয়ে।
এসইউজে/এএমএ
Reporter Name 















