বেনজীরকে ফেরত পাঠাতে তদন্তে নতুন মোড়

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় নতুন অগ্রগতি হয়েছে। তাকে হস্তান্তরের বিষয়ে নীতিগত সম্মতি জানালেও আইনি প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে চারটি বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে দুবাই পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুবাই পুলিশের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। এখন মূলত প্রত্যর্পণের আইনি ও কারিগরি বিষয়গুলো স্পষ্ট করতে চিঠির মাধ্যমে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সূত্র জানায়, ইন্টারপোলের মাধ্যমে পাঠানো দুবাই পুলিশের ওই চিঠি পাঁচ দিন আগে বাংলাদেশে পৌঁছেছে।
চিঠির জবাব প্রস্তুতে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টারপোল শাখার সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বেনজীর আহমেদের মামলার তদন্ত ও প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ করছে দুদক।
দুদকের উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম জানান, চিঠি পাওয়ার পর থেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুত জবাব পাঠানোর পর বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বেনজীর আহমেদের দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার তথ্য গত ১৪ জুন প্রথম জাতীয় সংসদে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো এক ই-মেইলে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়, দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে আটক করা হয়েছে।
এরপর বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বেনজীরের প্রত্যর্পণ চায়। দুদকের প্রস্তুত করা প্রায় ১৪৪ পৃষ্ঠার নথি আরবি ভাষায় অনুবাদ করে কূটনৈতিক মাধ্যমে দুবাইয়ে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে দেশে গ্রেফতারি পরোয়ানা, মামলার তথ্য এবং প্রত্যর্পণের প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংযুক্ত করা হয়। প্রায় এক মাস পর সেই আবেদনের জবাব দিয়েছে দুবাই পুলিশ। বেনজীর বর্তমানে দুবাইয়ের কারাগারে আটক আছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, দুবাই পুলিশের চিঠিতে মূলত চারটি বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ কোন আইনের আওতায় এবং কী প্রক্রিয়ায় বেনজীর আহমেদকে ফেরত নিতে চায়। কারণ, বাংলাদেশ ও ইউএইর মধ্যে বন্দী প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত কোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নেই। এ ছাড়া আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি কী, সেই পরোয়ানার কার্যকারিতা কতটুকু এবং পুরো প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় আইন মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে কেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বয় করছে—এসব বিষয়ে জানতে চেয়েছে দুবাই কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব প্রশ্ন আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ। প্রয়োজনীয় আইনি ব্যাখ্যা ও নথিপত্র প্রস্তুত করে খুব দ্রুত জবাব পাঠানো হবে। তাঁদের মতে, দুবাই পুলিশের চিঠির ভাষা থেকে স্পষ্ট, তারা বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেনজীর আহমেদ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং পরে আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০২৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্ত শুরু করে দুদক। পরে আদালতের আদেশে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের বিপুল সম্পদ জব্দ করা হয়। তদন্ত চলাকালে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে দেশ ছেড়ে যান।
পরবর্তী সময়ে বেনজীরের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোল তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার, জালিয়াতিসহ ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।
দেশ ছাড়ার পর থেকে বেনজীর আহমেদের অবস্থান সম্পর্কে দীর্ঘ সময় নিশ্চিত কোনো তথ্য ছিল না। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছেও নির্ভরযোগ্য তথ্য ছিল না।
বেনজীরকে গ্রেফতারের বিষয়ে দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতারের পেছনে তাঁরই কয়েকজন সাবেক সহযোগীর তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ব্যবসায়িক ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁরা দুবাই পুলিশকে তথ্য দেন। একটি শপিং মল থেকে বেনজীরকে আটক করা হয়। এ ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও দুবাই পুলিশের বিবেচনায় ছিল।
সান নিউজ/ / রাব্বি



