হেফাজতে মৃত্যু: কারাগার ও বাহিনীর জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন

রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় একজন নাগরিকের মৃত্যু যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। কারণ আইনগতভাবে আটক ব্যক্তি বা কারাগারে থাকা বন্দিদের নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশ হেফাজত, রিমান্ড এবং কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কার, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা, তদন্ত ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতির কারণে হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে রয়েছে।
হেফাজতে মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) নিয়মিতভাবে কারা হেফাজতে মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করে আসছে। তাদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৬১ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ জন ছিলেন বিচারাধীন বন্দি এবং ২৪ জন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, কারাগারে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনাকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ মৃত্যুর কারণ শুধু চিকিৎসাজনিত কিনা, নাকি অবহেলা, নির্যাতন বা অন্য কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে—তা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারাগারে মৃত্যুর পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।
প্রথমত, অনেক কারাগারেই ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি বন্দি থাকার অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত বন্দির কারণে চিকিৎসা, খাবার, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, কারাগারের চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বড় সমস্যা। জরুরি সময়ে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়া এবং হাসপাতালে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হলে ঝুঁকি বাড়ে।
তৃতীয়ত, বিচারাধীন বন্দিদের দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। দ্রুত বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন না হলে অসুস্থ বা বয়স্ক বন্দিদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
পুলিশ বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা আরও বেশি সংবেদনশীল। কারণ আটক ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ওপর থাকে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ উঠলে তদন্ত অবশ্যই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে। শুধু বিভাগীয় তদন্তের ওপর নির্ভর করলে অনেক সময় সাধারণ মানুষের আস্থা তৈরি হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ তদন্তে আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ থাকলে তা কঠোরভাবে বন্ধ করা জরুরি।
বাংলাদেশে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু প্রতিরোধে আইন রয়েছে। তবে মানবাধিকার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আইনের বাস্তব প্রয়োগ এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
তাদের মতে, ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অনেক সময় মামলা, তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়ায় নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়। ফলে অভিযুক্তদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়।
বর্তমান সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
বিশ্লেষকদের মতে, এজন্য কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ:
- হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করা।
- পুলিশ ও কারা কর্মকর্তাদের মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ বাড়ানো।
- থানার হাজতখানা ও কারাগারে নিয়মিত নজরদারি বৃদ্ধি করা।
- চিকিৎসা সুবিধা ও বন্দিদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।
- অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা।
- আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও মানবাধিকার
বিশ্বব্যাপী কারা ও পুলিশ হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষাকে মানবাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা স্বচ্ছভাবে তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মানদণ্ড শুধু নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে নয়, বরং নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন কতটা নিশ্চিত হচ্ছে তার মাধ্যমেও মূল্যায়িত হয়।
হেফাজতে মৃত্যু কমাতে শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।
প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারাগারের স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে বিচারাধীন বন্দিদের চাপ কমাতে হবে।
এছাড়া ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচারকদের মাধ্যমে নিয়মিত হাজতখানা ও কারাগার পরিদর্শন কার্যকর করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় হেফাজতে একটি মানুষের মৃত্যু শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহি, আইন প্রয়োগ এবং মানবাধিকারের পরীক্ষাও। তারেক রহমান এর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়েও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের সমস্যার সমাধান এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংস্কার। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।
সান নিউজ/ জামান



